মঙ্গলবার ২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্যানসার চিকিৎসা : জীবন বাঁচাতে দরকার সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

ডা. আরমান রেজা চৌধুরী   |   সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৬৯ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ক্যানসার চিকিৎসা : জীবন বাঁচাতে দরকার সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

বাংলাদেশসহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক দেশে ক্যানসার এখন ধীরে ধীরে বড় এক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। রোগীর সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে, কিন্তু চিকিৎসা সুবিধা সেই অনুপাতে বাড়েনি। বড় শহরের কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ চিকিৎসক ও সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু জেলা বা বিভাগীয় অনেক হাসপাতালেই ক্যানসার চিকিৎসার প্রাথমিক সুবিধাও সীমিত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে ক্যানসার চিকিৎসা কি বড় শহরেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে? কোন পদ্ধতিতে বেশি মানুষের কাছে চিকিৎসা পৌঁছানো সম্ভব?

বড় শহরের উন্নত ক্যানসার কেন্দ্রগুলোতে সাধারণত অভিজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক প্রযুক্তি, জটিল সার্জারি এবং উন্নত রেডিওথেরাপির সুবিধা একসঙ্গে পাওয়া যায়। জটিল ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই ধরনের কেন্দ্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ একসঙ্গে বসে রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন, ফলে চিকিৎসার মানও অনেক সময় উন্নত হয়।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের সব রোগী এই সুবিধার কাছে পৌঁছাতে পারেন না। দূর গ্রামের একজন দিন মজুরের কথা ভাবুন—যিনি প্রতিদিন কাজ না করলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়। তার পক্ষে কি মাসের পর মাস ঢাকায় থেকে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব? যাতায়াত খরচ, থাকার ব্যবস্থা, কাজের ক্ষতি—সব মিলিয়ে চিকিৎসার বাইরেও বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়। এই চাপ অনেক সময় রোগীদের চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ করে দিতে বাধ্য করে। তখন রোগ আরও জটিল হয়ে ওঠে, মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়।

এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি জেলা পর্যায়েই স্ক্রিনিং, বায়োপসি, কেমোথেরাপি এবং নিয়মিত ফলো-আপ চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে, তাহলে রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারবেন। ক্যানসারের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ যত দেরিতে ধরা পড়ে, চিকিৎসা তত কঠিন হয়ে যায়। তাই মানুষের কাছাকাছি চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো—শুধু কেন্দ্রীভূত বা শুধু বিকেন্দ্রীভূত—কোনোটিই এককভাবে যথেষ্ট নয়। কার্যকর সমাধান হতে পারে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। সেখানে জেলা পর্যায়ে থাকবে স্ক্রিনিং, প্রাথমিক চিকিৎসা ও কেমোথেরাপির সুবিধা, বিভাগীয় পর্যায়ে থাকবে মাঝারি স্তরের অনকোলজি সেবা; আর জাতীয় পর্যায়ে থাকবে উন্নত প্রযুক্তি ও জটিল চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত ক্যানসার সেন্টার। এতে রোগীরা প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা শুরু করতে পারবেন এবং প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট বড় কেন্দ্রে রেফার করা যাবে।

বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসা ব্যবস্থার সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, চিকিৎসা অবকাঠামোর অসম বণ্টন—বেশিরভাগ উন্নত চিকিৎসা এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক। দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনবলের অভাব। অনকোলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট এবং প্রশিক্ষিত অনকোলজি নার্সের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তৃতীয়ত, ক্যানসার চিকিৎসার আর্থিক চাপ অনেক পরিবারকে কঠিন সংকটে ফেলে দেয়। চতুর্থত, সচেতনতার অভাবে অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসেন। আরেকটি বড় সমস্যা হলো—দেশব্যাপী সমন্বিত ক্যানসার ব্যবস্থাপনার একটি শক্তিশালী জাতীয় কাঠামো এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।

এই পরিস্থিতি উন্নত করতে সরকার কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে পারে। ঢাকার বাইরে আটটি বিভাগীয় শহরে যে বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণাধীন সেই প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করা এবং প্রয়োজনে সেগুলোকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ এর আওতায় এনে যত দ্রুত সম্ভব চালু করা। পাশাপাশি মেডিকেল কলেজ ও জেলা শহরের সদর হাসপাতালগুলোতে ডে-কেয়ার কেমোথেরাপি ইউনিট চালু করা গেলে অনেক রোগী স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিতে পারবেন। একটি কার্যকর জাতীয় রেফারেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা দরকার, যাতে রোগী সহজে বুঝতে পারেন কখন এবং কোথায় যেতে হবে। টেলি-অনকোলজির মাধ্যমে জেলা পর্যায়ের চিকিৎসকেরা বড় কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। একই সঙ্গে অনকোলজি চিকিৎসক, মেডিকেল ফিজিসিস্ট ও প্রশিক্ষিত নার্স তৈরিতে এবং নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। স্বল্প আয়ের রোগীদের জন্য আর্থিক সহায়তা বা স্বাস্থ্য বীমা চালু করা এবং একটি শক্তিশালী জাতীয় ক্যানসার রেজিস্ট্রি তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত ক্যানসার চিকিৎসা শুধু প্রযুক্তি বা হাসপাতালের বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন, আশা এবং একটি পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। একজন দরিদ্র কৃষক যদি নিজের জেলার কাছেই চিকিৎসা নিতে পারেন, তবে তিনি চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারবেন। একজন মা যদি সময়মতো রোগ ধরা পড়ার সুযোগ পান, তাহলে হয়তো তার সন্তানদের তাকে হারাতে হবে না।

ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই জিততে হলে শুধু বড় বড় হাসপাতাল তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। চিকিৎসা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কেন্দ্রীভূত দক্ষতা এবং বিকেন্দ্রীভূত সেবার সমন্বয়ই পারে বাংলাদেশের অসংখ্য ক্যানসার রোগীর জীবন বাঁচাতে। এখনই সময় একটি সুসংগঠিত জাতীয় ক্যানসার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের, কারণ প্রতিটি দিনের দেরি মানে অপ্রয়োজনীয় অনেক মৃত্যু।

লেখক: ডা. আরমান রেজা চৌধুরী ,ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ,এভারকেয়ার হাসপাতাল ঢাকা

Facebook Comments Box
আরও
Chief Editor
Shahan Ahmed Chowdhury
Editor
J U Sumon
News Editor
Mehdi Hassan
UK Office
USA OFFICE
  • Hasan Hafizur Rahman
    264/A,Central Avenue
    Garden City
    NY 11040
    USA
সিলেট ব্যুরো
  • আব্দুর মুক্তাদির
    সিটি কর্পোরেশন মার্কেট (২য় তলা)
    চালিবন্দর, সোবহানীঘাট, সিলেট।
ঢাকা ব্যুরো
  • সৈয়দ আবু নাসের
    এমএস প্লাজা ২৮/সি/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০